সাইলেন্ট হার্ট এট্যাক ও আপনাদের গ্যাস্ট্রিকঃ
........................................
এখন একজন রোগী দেখলাম।
বয়স ৬৫।
ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত।
RBS 17.1 mmol/l
সকাল থেকে Epigastric pain
সাথে ঘেঁমে শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে।
পেটের উপরিভাগের যেখানে ব্যাথা হলে আপনারা গ্যাস্ট্রিক এর ব্যাথা ভাবেন, তাকে Epigastric region বলি আমরা এনাটমির ভাষায়।
তারপর বাসার লোক গ্যাস্ট্রিক এর ব্যাথা ভেবে পেনটোনিক্স ২০ একটা এবং অক্সিকোন সিরাপ দুই চামচ খাওয়ালেন।
তারপর নিয়ে যাওয়া হলো রোগীকে একজন স্থানীয় চিকিৎসক এর কাছে।
তিনি গ্যাস্ট্রিক এর ব্যাথা বলে ইঞ্জেকশন দিয়ে চিকিৎসা দিলেন।
কিন্ত রোগীর ব্যাথা না কমায় আসলেন আমার কাছে।
আমি হিস্ট্রি শুনেই বুঝলাম Heart attack হয়েছে রোগীর সেজন্যই ব্যাথা।
ইসিজি করলাম।
ইসিজিতে
Acute inferiolateral MI ডায়াগনোসিস হলো।
রোগীকে সিসিইউতে রেফার করলাম।
আমাদের দেশের লোকজন অনেকেই গ্যাস্ট্রিক এর ব্যাথা মনে করে heart attack বা MI এর ব্যাথাকে অবহেলা করেন যার পরিনতি অনেক সময় জীবন দিয়ে দিতে হয়।।
কয়েকমাস আগে একজন বৃদ্ধা নারীর ডেথ্ ডিক্লেয়ার করলাম সিএনজিতে।
রুগীটাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিলো চিকিৎসার জন্য।
কিন্ত আমার চেম্বারের সামনেই তিনি ইন্তেকাল করলেন।
জানতে চাইলাম রুগীর স্বজনদের কাছে কি সমস্যা হয়েছিলো।
তারা বললো, সকাল থেকে শরীর খারাপ লাগছিলো।
একবার শরীর খুব ঘামছে।
উনারা ভাবছেন, ডায়াবেটিস কমে গেছে।
তাই চিনি মিষ্টি খাইয়েছেন।
তারপর উনি ভালোই ছিলেন উনাদের ভাষ্য মতে।
কিছুক্ষণ পর শ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে দেখে নিয়ে আসছেন আমার কাছে।
শেষ কবে ডাক্তার দেখালেন জানতে চাইলে উনারা বললেন দুই বছর আগে।
এর মধ্যে আর ডাক্তার দেখাননি??
না, ভালোই ছিলো তাই দেখাই নি।
রুগীর মেয়ে বলেছিলো আমাকে।
এখন কিছু বিশ্লেষণ বলি।
এই রুগীটা সম্ভবত সেদিন সকালে হার্ট এট্যাক করেছিলো যাকে মেডিকেলের ভাষায় মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বলে।
সাধারণ রুগীরা হার্ট এট্যাক করলে বুকে প্রচন্ড ব্যাথা হয়, চাপ চাপ ব্যাথা অনুভূত হয়ে, ব্যাথা বুক থেকে গলায় যায়, ঘাড়ে যায়,হাতের দিকে যায়।
পেটেও যেতে পারে যেটাকে অনেকে গ্যাস্টিকের ব্যাথা মনে করে ভুল করে জীবন দিয়ে সেই ভুলের মাশুল দেন।
বুক থেকে পিঠেও ব্যাথা যেতে পারে।
সাথে শরীর ঘেমে যায়,হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়।
বমি বমি ভাব ও বমি হতে পারে।
শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
রুগী অস্থির হয়ে যেতে পারেন এংজাইটির জন্য এবং রুগীর চোখে মুখে মৃত্য ভীতি ফুটে উঠে।
কিন্ত একজন ডায়াবেটিস রুগীর সাইলেন্ট হার্ট এট্যাক হতে পারে।
রুগী একটু অস্বস্থি ভাব বা ঘেমে যাওয়া ছাড়া তেমন লক্ষণ থাকেনা।
হার্ট এট্যাকের মূল যে সিম্পটম তীব্র বুকে ব্যাথা তা ডায়াবেটিস রুগীদের হয়না অনেক সময়।।
এটাকে সাইলেন্ট হার্ট এট্যাক বলে।
এখন সেই রুগীকে যদি সকালে যখন শরীর খারাপ লাগছিলো তখন সাথে সাথে চিকিৎসক এর কাছে নিয়ে আসা হতো, তবে চিকিৎসক সব বিশ্লেষণ করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চিকিৎসা দিয়ে উনাকে বাঁচাতে চেষ্টা করতে পারতেন।।
উনার সন্তান ও পরিজনরা নিজ মায়ের প্রতি এতবড় অবহেলা করে মা কে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলেন।
বড় আফসোস লাগলো সেদিন।
আমাদের দেশের রুগীরা ঘরের এমন পন্ডিতদের পন্ডিতি ও পাক্নামির স্বীকার হয়ে মারা যান।
এমন শত উদাহরণ আমার নিজ অভিজ্ঞতায় দেখা।
এই রুগীর লোকেরাই যদি প্রাণ থাকতে হাসপাতালে বা ক্লিনিকে এসে পৌঁছতো, তখন যদি চিকিৎসা শুরু করার পর রুগী মারা যেত তখন তারাই ভুল চিকিৎসার অজুহাতে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে তুলকালাম করে ফেলতেন।
ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ডাক্তারদের হেনস্থা করতে দ্বিধা করতেন না।
ডাক্তারদের গালি দেন ঠিক আছে।
এসব এখন আমাদের সয়ে গেছে।
বাংলাদেশের ডাক্তারদের চামড়া গন্ডারের চামড়া।
গালি খেয়ে অভ্যস্ত আমরা।
তবে নিজে ডাক্তার না সেজে,নিজে নিজে রোগের ডাক্তারী ব্যাখ্যা না দিয়ে, কিছু হলেই গুগল থেকে মেডিকেল সাইন্স না পড়ে একজন পছন্দনীয় ডাক্তারের
কাছে চলে যাওয়া উচিত।
যেকোন সমস্যা সেটা ছোট বা বড় হউক, ডাক্তার এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অনেক রোগেরই Atypical presentation থাকে যেটা একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক ধরতে পারেন।
করোনাকালে তো আমরা দেখলাম দেশে কত কোটি কোটি ডাক্তার।
ফেসবুক খুললেই চারদিকে বিশেষজ্ঞ গুগল ডাক্তার।
উনারা নিজের চিকিৎসা নিজে তো করেনই, অন্যকেও ইনবক্সে জোর করে সেই চিকিৎসা দিতে চান।
সবচেয়ে মজার আমি একজন চিকিৎসক হবার পরেও গুগল প্রফেসররা করোনার বিভিন্ন চিকিৎসা নিয়ে আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন।
গুগল প্রফেসরদের কাছে নিজের মেডিকেলীয় জ্ঞান খুব তুচ্ছ মনে হতো তখন।।
আপনি সচেতন হউন।
আমাদের সচেতন নাগরিক দরকার।
আপনি সচেতন হলেই বেঁচে যাবে আপনার প্রিয়জন।
...............................

0 মন্তব্যসমূহ