প্রতিরাতেই এখন আমার বউটার গুনগুন করে কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। দেখি সে বিছানায় নেই। মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে কাঁদছে। প্রথম প্রথম খুব অস্থির লাগত আমার। এখন অনেকটা অভ্যাস হয়ে গেছে।
নির্লিপ্তভাবে বাবুর ডায়পার পাল্টে দেই, গলার কাছে ঘামটুকু মুছে দেই। তারপর ঘুমপাড়ানী গানের মত গুনগুন কান্নার শব্দটা শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়ি আবার।
১)
আমার বউ নীতি। পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়েছে আমাদের। খুবই লক্ষ্মী একটা মেয়ে। শান্ত,ঝর্ণার জলের মত স্বচ্ছ। ওর অভিমান, আনন্দ, দুঃখ সব ফুটে ওঠে চেহারায়। কারো সাথে হাসিমুখ ছাড়া কথা বলতে দেখিনি কখনো ওকে। সবাই সবসময় ওকে খুব পছন্দ করে।
বাবুর আসার খবর কেবল নিশ্চিত হয়েছি, এসময় নতুন বাসাটায় উঠলাম আমরা। গ্রাম থেকে আমার মাকে নিয়ে এলাম এখানে। নীতির বাবা মা কেউ নেই। আমি অফিসে চলে গেলেও এখন আর ওকে বাসায় একা থাকতে হবে না।
নীতির কুকুর খুব পছন্দ। আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে সে লাজুক লাজুক গলায় একটা পুডল চেয়েছিল আমার কাছে। কিন্তু আমার মার তীব্র প্রতিবাদে শখটা চাপা পড়ে গেছে। মার একটাই কথা,বাড়িতে কুত্তা থাকলে ফেরেশতা ঢুকতে পারে না।
তাই কুত্তা আনা যাবে না। তবে বিড়াল পালতে পারে।
কোত্থেকে একটা বিড়ালও নিয়ে এল মা।
বউটা আমার একটা কথাও বলেনি। শুধু শান্ত, গম্ভীর মেয়েটা আরো একটু শান্ত হয়ে গেল।
কয়দিন পর লক্ষ্য করলাম, নীতি বিড়ালটাকে একটুও পছন্দ করেনা। কাছে এসে পায়ে শরীর ঘষলে আমিও একটু আদর করে দেই চিকুকে। ও, চিকু আমাদের বিড়ালটার নাম। নীতি কখনো ছুঁয়েও দেখেনা চিকুকে। পশুপাখিদেরও ভালবাসা আর ঘৃণা আলাদা করার ক্ষমতা আছে বোধহয়। এজন্যে চিকুও নীতির আশেপাশে তেমন একটা আসে না।
২)
ভেবেছিলাম সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু একদিন হঠাৎ করে রুমে ঢুকতে গিয়ে দেখি নীতি চিকুকে এক পা তুলে লাথি দেয়ার চেষ্টা করছে। চোখদুটো প্রতিহিংসায় জ্বলজ্বল করছে ওর। আক্রমনাত্বকভাবে বেরিয়ে আছে দাঁতগুলো। আর চিকু মিঁউ মিঁউ করে পালানোর চেষ্টা করছে।
নীতির এই ভয়ানক রূপ আমি আগে কখনোই দেখিনি। সেদিন বুঝলাম, নীতি শুধু চিকুকে অপছন্দই করে না, ঘৃণা করে।
দরজাতেই থমকে দাঁড়িয়েছিলাম আমি। আমাকে দেখে খুব দ্রুতই নিজেকে সামলে নিল নীতি।
আমি অবশ্য চিকুকে অপছন্দ করার কোন কারন দেখিনা। ধবধবে সাদা রঙের আদুরে একটা প্রাণী। কি জানি কেন, আমার মিষ্টি বউটা বোধহয় বিড়াল জিনিসটাই পছন্দ করেনা।
খাওয়ার সময় একটু ভাত বা মাছের কাঁটার লোভে চিকু টেবিলের নিচে ঘুরে বেড়ায়। নীতি এখন এমনিতেই কিছু খেতে পারে না। শুধু খাবার নাড়াচাড়া করে। অল্প করে খেতে চেষ্টা করে। তবে খেয়াল করলাম, চিকু আশেপাশে থাকলে সে খাবার রেখেই উঠে চলে যায়।
একদিন গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে দেখি নীতি উঠে বসে আছে। মৃদু কাঁপছে ওর শরীর। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকিয়ে দেখি দরজার কাছে একজোড়া জ্বলজ্বলে সবুজ চোখ। কয়েকবার হুস হাস করেও যায় না। আমি বিছানা ছেড়ে উঠতে যেতেই নীতি আমাকে খামচে ধরল। ভয় পাচ্ছে সে। বেড সুইচটা জ্বালালাম হাত বাড়িয়ে। কোথাও কিচ্ছু নেই। তবে কি ভুল দেখেছিলাম!
আনজুমের সাথে কথা হয়েছে আমার। আমার স্কুল ফ্রেন্ড। এখন মোটামুটি নামকরা গাইনোকলজিস্ট। বাবু আসছে ধরা পরার পর থেকে নীতিকে সে ই দেখছে।
আনজুম আমাকে আশ্বস্ত করল, প্রেগন্যান্সিতে মেয়েদের নাকি বিভিন্ন রকম সাইকোলজিকাল পরিবর্তন হয়। মনে করে কেউ তার বাচ্চাটার ক্ষতি করবে। এটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু না। শুধু একটু সাবধানে দেখে শুনে রাখতে হবে তাকে।
৩)
বিড়ালটাকে লাথি মারতে গিয়ে নীতি একদিন পা পিছলে পড়ে গেল। ওর তখন সাড়ে সাতমাস চলছে। আর একটু হলে বাবুকে হারাতাম আমরা। কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে মা ছুটে এসে দেখে নীতি পড়ে গেছে আর পেট চেপে ধরে কাতরাচ্ছে। মেঝে ভেসে যাচ্ছে রক্তে। তার মধ্যেও অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা চিকুকে হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে সে।
সময়ের অনেক আগেই বাবু এল পৃথিবীতে। প্রথমে সবাই ভেবেছিল বাঁচবেনা। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে বেঁচে গেল সে। আমার নীতিও। তবে কেমন যেন হয়ে গেল সে এরপর থেকে। কেমন আনমনা হয়ে থাকে সব সময়। লুকিয়ে বোধহয় কাঁদেও।
অনেকদিন হাসপাতালে থাকার পর ওদের দুজনকে বাড়ি নিয়ে এলাম। মা গ্রামে চলে গেছে। এখন বাসায় শুধু আমরা তিনজন মানুষ।
অপয়া বিড়ালটাকে একদিন ফেলে দিয়ে আসলাম বাড়ি থেকে বেশ দূরে। নীতি এ নামেই ডাকে ওটাকে। কিন্তু সেটা কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ফিরে এল। যতদূরেই ফেলে আসি, কোন লাভ হয়না। ঠিক ঠিক পথ চিনে ফিরে আসে।
নীতি প্রায়ই বলত, বিড়ালটাকে নিজের চোখে মরতে দেখলে তবে শান্তি পেত।
বাবুর দিকেও তার কোন খেয়াল নেই।
বাবুকে ফিডার খাওয়াতে খাওয়াতে উঠে গেছিলাম কি কারনে যেন। ফিরে দেখি ফিডারটা ফেলে চিকু দুধ খাওয়ার চেষ্টা করছে।
৪)
ব্যাপারটা খুব অপছন্দ হলেও একদিন নীতিকে নিয়ে বের হলাম। হাতের বস্তায় চিকু। নীতিকে সুস্থ করে তোলার আর কোন উপায় দেখছি না। বাবুকে কেবল ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছি। বেশিক্ষণ সময় লাগবে না।
নীতি কয়েকবার জানতে চেয়েছিল কোথায় যাচ্ছি। কিছুই বলিনি আমি।
বাড়ি থেকে দুই মিনিটের দূরত্বে রেল লাইন। ওকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে ট্রেন আসতে দেখলাম। মুখবন্ধ বস্তাটা আস্তে করে লাইনের ওপর রেখে পিছিয়ে এলাম।
ট্রেন প্রায় চলে এসেছে,এমন সময় নীতি বুঝতে পারল কি হতে যাচ্ছে। চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল ট্রেনের নিচে। দুই হাতে জড়িয়ে ধরে আটকাতে পারছিনা ওকে। ট্রেন চলে গেলে আমার কোলে ঢলে পড়ার আগে শুনতে পেলাম সে বিরবির করছে, "আমার বাবু ..."
নীতির জ্ঞান ফিরল দুদিন পর। কারো সাথে এখন আর কথাই বলেনা। মাঝে মাঝে প্রতিহিংসা নিয়ে বাবুর দিকে তাকায়। রাতবিরাতে উঠে একা একা কাঁদে। অনেক ডাক্তার দেখিয়েও লাভ হয়নি। ওর ধারণা আমাদের বাবু সেদিন মারা গেছে ট্রেনের নিচে। এটা আসলে অশুভ বিড়ালটা বাবু সেজে আছে।
কষ্ট হয় নীতির জন্য। কিন্তু বাবুর যত্ন নিতে গিয়ে আমার দিনরাত এক হয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা হয়েছেও আমার জন্যে পাগল। কোল থেকে নামালেই কান্না শুরু করে দেয়। দেখতেও দিনদিন কি যে সুন্দর হচ্ছে! ধবধবে সাদা গায়ের রং। শুধু চোখের রংটা একটু কেমন যেন। আমার বা নীতির কারো মতই না। হালকা সবুজ। তবুও সুন্দর। ওকে যখন কোলে নেই হাতে শরীর ঘষে কি আদুরে শব্দ করে.........
অবশেষ
আমি নীতি। বিয়ের বেশ কিছুদিন পরে বুঝতে পারি যে আমার স্বামীর মাথায় সমস্যা আছে। ছোটবেলা থেকে অনাথ আশ্রমে মানুষ হয়েও সে মানতে পারেনি তার বাবা মা নেই। অথবা খুব ছোটবেলায় তাকে ফেলে চলে গেছে। আমার মা কে সে প্রায়ই ভাবত তার মা এটা। আমার কেউ নেই। আমাকে বলত, মন খারাপ করোনা। তোমার বাবা মা নেই তাতে কি হয়েছে। আমি তো আছি।
প্রথম কারো ভালবাসা পাওয়া তার এই প্রথম। এ কারনে পাগলের মতই ভালবাসে আমায়। ভালবাসত আমাদের পৃথিবীতে আসতে না পারা বাবুকেও। ভেবেছিলাম ভালবাসা দিয়ে তার সব সমস্যা ঠিক করে ফেলতে পারব একদিন।
বাচ্চাটা নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল আমাদের। ঘর ভর্তি করে খেলনা নিয়ে আসত সে রোজ।
কিন্তু ঘরের মেঝেতে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার পর ওকে হারাই আমরা। আমার স্বামী মানতে পারেনি এটা। বাবুর জন্য কিনে আনা পুতুলটা জড়িয়ে সারাদিন বসে থাকে তারপর থেকে। তাকে খাইয়ে দেয়, গোসল করায়, একটা সত্যিকারের বাচ্চার মত সব কিছুই করায়।
সে সিজোফ্রেনিক। এমন অনেক কিছুই দেখতে পায়, শোনে, যার কোন অস্তিত্বই নেই আসলে। দিন দিন অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। কোন চিকিৎসাতেই কাজ হচ্ছে না।
প্রথম সন্তান হারানো, সাথে স্বামীর পাগল হওয়া, একটা নারীর জন্য কি এই শোকের কোন তুলনা আছে? এখনো গভীর রাতে ওকে পুতুলটা নিয়ে খেলতে দেখি আর কাঁদি আমি। বাচ্চাটা বেঁচে থাকলে কত সুখের সংসার হত আমাদের।
আর, ওর ডায়েরী আমি পড়েছি। আমাদের বাড়িতে কিন্তু কোন বিড়াল ছিলনা কখনোই.......
.
©ডাঃ নিপা
0 মন্তব্যসমূহ